Thursday, 31 July 2025

শান্তিদেবের বোধিচর্যা সংক্ষেপে লিখ। অথবা, শান্তিদেবের যটপারমিতা বলতে কী বুঝিয়েছেন?

প্রশ্ন - ৭: শান্তিদেবের বোধিচর্যা সংক্ষেপে লিখ।

অথবা, শান্তিদেবের যটপারমিতা বলতে কী বুঝিয়েছেন?


উত্তরা:

ভূমিকা: বাঙালি দর্শনের মধ্যে বৌদ্ধদর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন। এ দর্শনের মধ্যে যে কয়জন বাঙালি বৌদ্ধ দার্শনিক প্রভাব বিস্তার করেছেন তাদের মধ্যে শান্তিদেব ছিলেন। অন্যতম। তিনি ছিলেন মহাযান সম্প্রদায়ের একজন ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক। তিনি যে সমস্ত গ্রন্থ রচনা করেছেন তার অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় রচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে 'শিক্ষা সমুচ্চয়' ও 'বোধিচর্যাবতার' প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ।

 শান্তিদেবের বোধিচর্যা বা ষটপারমিতা শান্তিদেবের মতে, মানবতার পূর্ণ বিকাশে বৌদ্ধদর্শনে যে সাধনা বা চর্চার কথা বলা হয়ে থাকে তার নাম ষটপারমিতা। পারমিতা শব্দের অর্থ যা পারে গিয়েছে অর্থাৎ যা সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষ প্রাপ্ত হয়েছে। পালি বৌদ্ধ শাস্ত্রে দশ পারমিতার কথা বলা হয়েছে কিন্তু বৌদ্ধদর্শনে দশ পারমিতার স্থলে ছয় পারমিতার কথা বলা হয়েছে। এ ছয়াট পারমিতা মহাযান বৌদ্ধধর্ম দর্শনে ষটপারমিতা নামে পরিচিত। নিম্নে ঘটপারমিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. দান পারমিতা: মানুষ মাত্রই স্বার্থপর। স্বার্থপর ব্যতীত মানুষ পাওয়া খুবই কষ্টকর। মানুষ সবসময় অন্যের ভালোর কথা চিন্তা না করে নিজের ভালোর কথা চিন্তা করে। কিন্তু দান পারমিতার লক্ষ্য হলো সাধকের নিজের মধ্যে যা কিছু আছে তার বিনিময়ে কোন কিছুর আশা না করে তাপরের কল্যাণে বা মঙ্গলে তা বিলিয়ে দেয়া।

২. শীল পারমিতা: পৃথিবীতে সবসময় দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগেই রয়েছে। এ দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে উত্তরের পথ বের করার চেষ্টা করতে হবে। বিশ্বের এ যাবতীয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও অশান্তির মূল কারণ হলো পঞ্চবিধ। এ পঞ্চবিধ পাপকার্য হলো- প্রাণী-হিংসা হতে বিরত, পরস্বাপহরণ হতে বিরত, ব্যভিচার হতে বিরত, মিথ্যা বলা হতে বিরত, মাদকদ্রব্য সেবন হতে বিরত।

৩. ক্ষান্তি পারমিতা: মানুষ ক্ষমতাশীল। ক্ষমার দৃষ্টিতে মানুষ সবকিছু দেখে থাকে। তাই ক্ষান্তি পারমিতার লক্ষ্য হলো ক্ষমাশীলতার অনুশীলন করা। মানব সমাজে একে অপরের প্রতি হিংসা, মারামারি, কাটাকাটি হতে বিরত থাকাই হলো ক্ষান্তি পারমিতা।

৪. বীর্য পারমিতা: মহাযান বৌদ্ধ দর্শনে কুশল-কর্মে উৎসাহকেই বলা হয় বীর্য। বীর্য পারমিতার লক্ষ্য হলো কুশল বা শুভ ও মঙ্গলের প্রতি উৎসাহ লাভ করা। বীর্যের প্রতিপক্ষ হচে আলস্য, কুৎসিত বিষয়ে আসক্তি, বিষাদ, নিজের প্রতি অবিশ্বাস।

৫. ধ্যান পারমিতা: বৌদ্ধদর্শনে বুদ্ধত্ব লাভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ধ্যান বা সাধনা করা। সাধক ধ্যানমগ্ন হয়ে সাধনা করে দিব্য জ্ঞানলাভ করতে পারে। জগতের জাগতিক বস্তুরাজি এবং সমস্ত কিছু তিনি এ জ্ঞান দ্বারা বুঝাতে পারেন। সাধক সবসময় নির্জন স্থানে ধ্যানমগ্ন হবেন এটিই খ্যান পারমিতার লক্ষ্য।

৬. প্রজ্ঞা পারমিতা : ধ্যান ও প্রজ্ঞা এ দুটির সম্মিলিত চর্চা দ্বারাই নির্বাণ লাভ করা যেতে পারে। পূর্বোক্ত পঞ্চবিধ ষটপারমিতার শেষোক্তটি হলো পারমিতার অনুশীলন বা চর্চার দ্বারা- সাধক জগতের সমস্ত রহস্য ও অজানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শান্তিদেবের ষটপারমিতার সাধনা দ্বারা সম্যক জ্ঞানলাভ করা সম্ভব হয়। শান্তিদেবের ষটপারমিতাই হলো বৌদ্ধদর্শনে মানবতাবাদের নির্দেশক। একজন সাধক যদি ভার ছয়টি গুণ অর্জন করতে সমর্থ হয় তাহলেই সে সফলতা অর্জন করতে পারে।


No comments:

Post a Comment

চর্যাপদের সহজিয়া দর্শন কি?

 প্রশ্ন - ১২: চর্যাপদের সহজিয়া দর্শন কি? উত্তর: বাংলা সাহিত্য ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ও আদি নিদর্শন হলো চর্যাপদ বা চর্যাগীতি। চর্যাপদের পদগুল...